
রুকমা বাঈ,প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি বাল্যবিবাহের আইন পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছিলেন।(জন্ম১৮৬৪,২২ নভেম্বর,মৃত্যু-১৯৫৫,২৫ সেপ্টেম্বর)
আমরা বাঙালি মেয়েরা প্রতিদিন স্মরণ করি বিদ্যাসাগর, রামমোহন কে সহমরন ও বিধবাবিবাহ প্রবর্তন করে আমাদের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য।কিন্তু মনে রাখিনি তাঁকে,যিনি আজ থেকে ১৩৯বছর আগে অসম্মতিসূচক বাল্যবিবাহ র মত অভিশাপ থেকে আমাদের বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছিলেন, কারাবরণ করেছিলেন এবং তিনি আইন বদল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।তিনি রুকমাবাই।১৮৬৪ সালে ২২ নভেম্বর এক মারাঠা পরিবারে জন্মেছিলেন।তাঁর ও বিবাহ হয় মাত্র ৯ বছর বয়সে ভিখাজী র সঙ্গে।ভিখাজী অলস ও পড়াশুনায় অনাগ্রহী ছিলেন।অন্যদিকে রুকমাবাই পড়াশুনা করছিলেন।নিয়মমতো ঋতুমতী হওয়ার পর তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় চলে এলো। কিন্তু তিনি বেঁকে বসলেন।কারণ এই বিয়ে তাঁর সম্মতিতে হয় নি।তাঁকে পূর্ন সর্মথন করলেন তাঁর সৎ পিতা ডাক্তার সখারাম অর্জুন।সখারাম নারী শিক্ষা ও প্রগতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।তিনি বুঝেছিলেন ওই বয়স বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ঠিক নয়। ভিখাজি আশা করেছিলেন অনেক পন ,উপঢৌকন নিয়ে রুকমা তার বাড়ি আসবেন।তা না হওয়ায় তিনি ক্রুদ্ধ হলেন।অতঃপর দাম্পত্য অধিকার আইন অনুযায়ী আদালতে মামলা করলেন।যে আইন অনুযায়ী স্ত্রী কোন কারণ ছাড়া স্বামীর সঙ্গে বাস না করলে শাস্তি যোগ্য অপরাধ।সেটি 1885 সাল।যে মামলা" ভিখাজি বনাম রুকমা বাঈ ১৮৮৫" নামে আলোড়ন ফেলে দিলো।দমে যায় না রুকমাও।তাঁর পিতার সমর্থনে সেও একটি মামলা করে।স্বামীর সাথে বিবাহিত জীবনযাপন না করার জন্য।শুধু স্বামীর সাথে বসবাস না করার জন্য নয়,সাম্মতিসূচক বিবাহের আইন আনার জন্য লড়াই করেন।কলম ধরেন ছদ্মনামে, টাইমস অফ ইন্ডিয়া য়।ছদ্মনাম ছিল "the hindu lady"।তাঁর সমর্থনে বিদেশে কলম ধরেন ম্যাকসমূলার ও ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।দেশের বিদ্ব সমাজ প্রবল বিরোধিতা করলো। বাল গঙ্গাধর তিলক ,কেশরী পত্রিকা য় লিখলেন, 'ইংরেজি শিক্ষার কুফল',এবং ঘোষণা করলেন' হিন্দু ধর্মের বিপদ'।তিলক আরও বলেন,তিনি বিচারক হলে রুকমা বাঈ কে শাস্তি দিতেন।,
,সবদিক বিবেচনা করে বিচারক পিনহে রুকমার পক্ষে রায় দিলেন।বলেন এই বিয়ে 'অসহায় শৈশব' অবস্থায় হয়েছিল তাই রুকমা স্বামীর কাছে যেতে বাধ্য নন। কিন্ত এই বিচার, বিরাট বিতর্কের জন্ম দেয়।সারাদেশে অসন্তোষ সৃষ্টি হোলো।অবশেষে "রুকমা বাঈ মামলা " নারীর অধিকারের লড়াই এ দাঁড়িয়ে গেলো।পরিস্থিতি সাপেক্ষে আপিল আদালত হিন্দু আইন অনুযায়ী পুনর্বিবেচনার জন্য মামলাটি কে সামনে আনে। বিচার শোনানো হয়,রুকমা স্বামীর কাছে না গেলে ছমাসের কারাদন্ড হবে। ছমাসের কারাদন্ড মেনে নিয়ে রুকমা স্বামীর কাছে গেলেন না। রুকমা অবশেষে রানী ভিক্টরিয়া কে চিঠি লিখলেন।ভারতবর্ষে হিন্দু মেয়েদের করুন অবস্থার কথা তুলে ধরে আর্জি জানালেন ,মেয়েদের সম্মতিতে বিবাহ হওয়া উচিত,এমন আইন প্রবর্তন করে হিন্দু মেয়েদের বাঁচানোর জন্য।,,কুড়ি বছরের ছেলে ও পনেরো বছরের মেয়ের সম্মতিতে বিবাহ আইন ব্যাবস্থা আনার জন্য।,,সেই লড়াই ও চিঠি লেখার ফল মিলল।রচিত হোলো "সম্মতি বয়সের বিবাহ আইন"।আজ থেকে ১৩৯ বছর আগে ইতিহাস তৈরী করলেন নাছোড় মেয়েটি।রুকমা বাঈ। তিনি আমাদের জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্ত করলেন। পরে জেল থেকে বেরিয়ে এসে আবার পড়া আরম্ভ করেন।১৮৮৯ সালে ডাক্তারি পড়ার জন্য বিলেত যান।১৮৯৮ সালে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি,আনন্দীবাই জোশী র ৮ বছর পর রুকমা বাঈ ডাক্তারি পাশ করেন।দেশে ফিরে এসে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সার্ভিস এ যোগদান করেন।
আজ থেকে ১৬০ বছর আগেএমনই এক নভেম্বর মাসের ২২ তারিখ এই মহিয়সী জন্মেছিলেন। রুকমা বাঈ সমাজের বিরুদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে হিন্দু মেয়েদের বাঁচার ,নারী অধিকার কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,সেই অসামান্য সাহসিকা,আলোকস্তম্ভ র কথা আমাদের প্রজন্ম প্রায় ভুলে গেছি। এ আমাদেরই অজ্ঞতা এবং কৃতঘ্নতা।
রমা রায় হালদার
স্কুল শিক্ষিকা। / বাচিক শিল্পী।
July, 2026