An Exclusive interview

শ্রীমতি চৈতালি চ্যাটার্জি

রঙের আলোয় এক জীবন: প্রবীণা চিত্রশিল্পী শ্রীমতি চৈতালী চ্যাটার্জির সাথে কথোপকথনে তুলি গুহ

তুলি : কলকাতা শহরের সম্মানীয় প্রবীণা চিত্রশিল্পী শ্রীমতি চৈতালী চ্যাটার্জি, আমার খুব প্রিয় চৈতালিদি। জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩শে মার্চ। বিজ্ঞাপন জগতের বিশেষ প্রভাবশালী সম্মানীয় ব্যক্তি, Art Connoisseur মৃত্যুঞ্জয় চ্যাটার্জি ওনার জীবনের চলার পথের সঙ্গী। ওনাদের একমাত্র কন্যা মধুবনী চ্যাটার্জী, একজন কৃতি ভারতনাট্যম নৃত্যশিল্পী। চৈতালিদি, তোমাকে অনেক ভালোবাসা জানিয়ে শুরু করি আজকের এই কথোপকথন। তোমার শৈল্পিক জীবনের গল্প শোনার জন্য অধীর হয়ে আছি।

চৈতালী দি : ভালোবাসা রইল তোমার জন্যও, তুলি।

চৈতালী দি : অল্প বয়স থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি শিল্পের প্রতি আমার একটা আলাদা ভালোবাসা ছিল, একটা টান ছিল। ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলে পড়াকালীন আমি নিয়মিতভাবে নৃত্য আর সঙ্গীত শিক্ষা নিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমি ছবি আঁকাকেই প্রাধান্য দিলাম, চিত্রশিল্প চর্চাতেই নিজেকে নিয়োজিত করলাম। পরিণত বয়সে নিজেকে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলাম।

তুলি : আর্ট কলেজের দিনগুলোর কথা যদি একটু বলো…

চৈতালী দি : ১৯৬৩ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম, প্রথাগতভাবে ছবি আঁকা শেখার জন্য। প্রথম দু'বছর শিল্পের সব বিষয়েই সমানভাবে পড়ানো হয়েছিল। থার্ড ইয়ারে গিয়ে নিজের পছন্দের বিষয় হিসেবে ফাইন আর্টস বেছে নিলাম, আর সেই বিষয়ে বিশদে পড়াশোনা শুরু করলাম। জানো তুলি, আর্ট কলেজের সেই দিনগুলো ছিল যেন শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত কিছু দিন। আমার কাছে সেটা যেন আমার নিজের 'মুক্তি আলোয় আলোয়'।

...

তুলি : সেই সময়ের কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?

চৈতালী দি : এখনো স্মরণ করি, ওই সময় কলেজে আমি কখনো কোনো ক্লাস মিস করিনি। কলেজের দিনগুলো ছিল আমার কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর। একদিকে পেয়েছিলাম নিজের পছন্দের শিক্ষার আলো, আর তেমনি পেয়েছিলাম প্রাণাধিক প্রিয় সব বন্ধুদের সাহচর্য। শিক্ষা আর বন্ধুত্বের সেই স্বর্ণযুগ স্থায়ী হয়েছিল পাঁচ বছর। আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সেই সময়ের কিছু কিংবদন্তি শিক্ষক আজও নিজেদের কৃতিত্বে উজ্জ্বল হয়ে আছেন - গোপাল ঘোষ, রথীন মৈত্র, অরুণ বসু, সত্যেন ঘোষাল এবং আরো অনেকে। এই মহতী শিক্ষকদের নাম বলার সময় আজও আমি খুশি হয়ে উঠি, কলেজের দিনগুলোতে ফিরে যাই।

তুলি : কলেজ শেষ হওয়ার পর শিক্ষকতার জীবন কীভাবে শুরু হলো?

চৈতালী দি : পাঁচ বছরের BFA শিক্ষার ফল প্রকাশের আগেই আমি নব নালন্দা স্কুলে আর্টের শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করি। ফল প্রকাশের পর বিড়লা অ্যাকাডেমি আর্ট স্কুল থেকেও ডাক পেলাম। সেই সময় নব নালন্দা স্কুলে সোম থেকে শুক্র, আর বিড়লা অ্যাকাডেমিতে শনি ও রবিবার আর্ট ক্লাস নিতাম। এর পাশাপাশি নিজের বাড়িতেও 'রেনবো আর্ট স্কুল' নামে একটি আঁকার স্কুল চালু করলাম।

তুলি : এই সময়েই তো তোমার বিবাহিত জীবন শুরু হয়?

চৈতালী দি : হ্যাঁ, ছাত্র-ছাত্রী তৈরি করার এই সময়েই, ১৯৭৩ সালে, আমি বিবাহিত জীবনে আবদ্ধ হই আমারই সহপাঠী মৃত্যুঞ্জয় চ্যাটার্জির সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে আমাদের জীবনে আসে মধুবনী।

তুলি : মধুবনীর নাচের প্রতি ভালোবাসা দেখে তুমি তো একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে। সেই কথাটা একটু বলবে?

চৈতালী দি : মধুবনী কিছুটা বড় হওয়ার পর ওকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার তাগিদ অনুভব করলাম, মনে হলো ওকে আরও বেশি সময় দেওয়া প্রয়োজন। এই ভাবনাতেই আমি চাকরিজীবন থেকে অবসর নিলাম। মধুবনী যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী, তখন মা হিসেবে আমি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিই। লক্ষ্য করেছিলাম নাচের প্রতি মধুবনীর এক অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সাধনা আছে। ওর সেই নিষ্ঠা, সাধনা আর একনিষ্ঠ পরিশ্রম দেখে আমি স্থির করলাম, আমার মেয়ে এখন থেকে আর স্কুলে যাবে না। সে নিজের বাড়িতেই বিভিন্ন প্রথিতযশা শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে লেখাপড়ার তালিম নেবে, আর নাচের শিক্ষার জন্য পাঠাব প্রখ্যাত গুরু থাঙ্কুমনি কুট্টির কাছে। মধুবনী সেই সময় পাঠভবনে পড়ত। আমার সেই সিদ্ধান্তকে পাঠভবন স্কুলও সমর্থন করেছিল। মা হিসেবে ঠিক করেছিলাম, মেয়ের সেই প্রস্ফুটিত হবার সময়ে নিজের শিল্পচর্চাকে সাময়িক বিরতি দিয়ে ওর শিল্পচর্চাকেই প্রাধান্য দেব।

তুলি : তার মানে কি তুমি নিজের ছবি আঁকা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলে সেই সময়?

চৈতালী দি : না গো, সেটা একেবারে পারিনি। একজন শিল্পময়ী মা হিসেবে শিল্পচর্চার আদরেই আমি আমার সন্তানকে বড় করে তুলেছি। এক সুন্দর ছন্দে সংসার আর শিল্প - দুটোকেই একসাথে গড়ে চলেছি নিরন্তর। আর এই সুন্দর সংসারের আবহাওয়া আমার স্বামীর পাণ্ডিত্যের পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। উনিও নিজের জগতে ক্রমাগত এগিয়ে গেছেন, হয়ে উঠতে পেরেছেন বিজ্ঞাপন জগতের একজন মহীরুহ।

তুলি : এখন, এই বয়সে এসে, তোমার শিল্পচর্চার বর্তমান অবস্থা কেমন?

চৈতালী দি : এখন আমার বয়স সাতাত্তর। আর আমার শিল্পচর্চা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। Dry pastel আর Oil pastel, এই দুই ধরনের প্যাস্টেল মিলিয়ে রং করতে আমার ভালো লাগে। অয়েল কালারের ফিনিশিং টাচ আমি প্যাস্টেল কালারেই প্রকাশ করি। ইদানিং আমার কয়েকটা পেইন্টিংয়ে দেখা গেছে আমি বেশ উজ্জ্বল রঙের ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে পছন্দ করি। জানো, কলেজেও এই ধরনের উজ্জ্বল রং ব্যবহার করে ল্যান্ডস্কেপ আঁকতেই আমার সবচেয়ে ভালো লাগত।

তুলি : ছবি আঁকা নিয়ে কোনো এমন কথা, যা তুমি সবসময় বিশ্বাস কর?

চৈতালী দি : একটা কথা আমি খুব বিশ্বাস করি - মন থেকে হলে তবেই সেই ছবি আঁকাটা সুন্দর আর সম্পূর্ণ হয়। মন না বসলে শুধু ছবি আঁকা কেন, কোনো কাজই ঠিকমতো সম্পূর্ণ হয় না।

তুলি : মধুবনীর জন্মদিনে তুমি নাকি কবিতা লিখে দাও - এটা সত্যি?

চৈতালী দি : হ্যাঁ, মধুবনীর জন্মদিনের কার্ডে ওকে আশীর্বাদস্বরূপ কবিতা লিখে দেওয়া আমার একটা অতি ভালোবাসার কাজ।

তুলি : এখন, জীবনের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে কেমন লাগছে?

চৈতালী দি : সংসারের সবাইকে নিয়ে আমি খুব গর্বিত আর খুশি। এখন বহু শারীরিক বাধা সত্ত্বেও মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে, মধুবনীকে নিয়ে আর নিজেদের শিল্পচর্চা নিয়ে আমার এবং আমাদের প্রতিটা দিন খুব আনন্দের সাথে কাটে। আর একটা কথা বলতেই হয় - বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও আমার অসংখ্য পুরনো ছাত্র-ছাত্রীরা আজও নিয়মিত যোগাযোগ রাখে, এটা আমার কাছে বিশাল এক পাওয়া।

তুলি : চৈতালিদি, তোমার সাথে এই কথোপকথন সত্যিই আমার কাছে এক বিশেষ প্রাপ্তি। তোমার দীর্ঘ শৈল্পিক জীবন কামনা করি। আন্তরিকভাবে চাই তুমি এভাবেই মনের আনন্দে আরও ছবি আঁকো, সুস্থ থাকো।

(সাক্ষাৎকার: তুলি গুহ)