
হ্যাঁ ইচ্ছেটাতো ছিলোই। কিন্তু সব ইচ্ছে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনির সুরধারায় আর কনকাঞ্জলির তলায় চাপা পড়েছিলো দীর্ঘ চব্বিশ বছর।
মেয়েটা যে নিজের প্রতিটা রক্ত বিন্দুতে সুর নিয়ে জন্মেছিলো। তাইতো খুব ছোট্টোবেলাতেই বাবার দেওয়া শিস্ শুনে আদো আদো স্বরে গাইত, 'ঐ গাছের পাতায়, রোদের ঝিকিমিকি'। সন্ধ্যাবেলায় মায়ের কোলে বসে মায়ের সাথে সুরে সুর মিলিয়ে গাইত, 'নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝি বা পথ ভুলে যায়'।
তবে সুর থাকলে তো হবে না। সাধনাও তো করতে হবে। সাধনা ছাড়া সিদ্ধিলাভ হয় না যে। আর সুরসাধনা করতে গেলে একটা হারমোনিয়াম বড্ড প্রয়োজন। কিন্তু প্রায় বারোজনের সংসারে মেয়েটির বাবা একা সরকারি চাকুরে। তাই সাধ থাকলেও সাধ্য অধরা! এছাড়া মেয়েটি লেখাপড়া করতে বসলেই ঠাকুমা বলে, 'হুঃ লেখাপড়া শিইক্ষা ম্যামসাহেব হইবো'। তার উপরে গান শিখলে ফিল্ম স্টার হইবো বলে আরও বিদ্রূপ করতো!
শুরু হয়ে গিয়েছিলো স্কুলজীবন তার সাথে খেলাধূলা চর্চার জন্য ব্রতচারীতে ভর্তি। সেখান থেকেই ব্রতচারীর সব গান, 'আও সখী আও সব সখী আও বাহারিয়া ক্যায়সে খেল রাহি হ্যায়', 'চল্ কোদাল চালাই ভুলে মানের বালাই' এইসব গান সে একবার শুনেই গেয়ে ফেলতো সুরে সুর মিলিয়ে। সবাই কত ভালোবাসতো এই গুণের জন্য। দেখতে দেখতে পঞ্চম শ্রেণী। দিদিমা বলেছিলেন, "যদি অ্যাডমিশন টেষ্টে ভালো ফল করতে পারো তাহলে হারমোনিয়াম কিনে দেবো"। অত্যন্ত ভালো ফল লাভ করে বাড়ির কাছেই মন্মথনাথ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হয়ে গেলেও হারমোনিয়াম বাড়িতে এলো না। দিদিমা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মেয়েটি নিরাশ হলো না। অপেক্ষা তো করা যেতেই পারে।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিদিমার অর্থ সাহায্যেই ইছাপুরের কণ্টাদার থেকে হারমোনিয়াম এসে পৌঁছেছিলো মেয়েটির কাছে। তখন ও ষষ্ঠ শ্রেণী।
সপ্ত সুর চিনতে শেখা বাগুদাদুর কাছে। বাগু দাদুর চোখদুটো আটবছর বয়সে টাইফয়েডে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেলেও সুরসাধনায় তিনি হয়েছিলেন বেহালা অন্ধস্কুলের বেহালার শিক্ষক শ্রীযুক্ত বাগুরঞ্জন সোম। ওনার কাছে সঙ্গীতের প্রথম পাঠ নেওয়ার পর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখার সুযোগ হয়েছিলো শ্রদ্ধেয় চিত্ত দাস, অনুভা মুখার্জী ও চম্পা গুহ ঠাকুরতার কাছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি সঙ্গীতের আরাধনায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলো মেয়েটি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি তার গাইতে ভালো লাগতো ভাটিয়ালী-বাউল-পল্লীগীতি। সেই সকল গানের সুরে মেয়েটি অনেকের মন জয় করে নিয়েছিলো। ওর চড়া স্কেলের গণসঙ্গীতে সবাই মুগ্ধ হোতো। স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা, বন্ধু-বান্ধবরা তার গান শোনার জন্য কোনো সময় বাছতো না। যে কোনো সময় ওর গান শুনতে পছন্দ করত, আনন্দ পেত।
ছাত্রীজীবন ও সঙ্গীত জীবনের পাশাপাশি কর্মজীবনে পা রেখেছিলো সে। একসময় গুহ বংশের বড় মেয়েটি তার মেয়েবেলা পার করে পাড়ি দিয়েছিলো শ্বশুর বাড়ি। সিঁথির একটু সিঁদুরে বদলে গিয়েছিলো জীবন। পায়ে বেড়ি বেঁধে সংসারের যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে পিশে যাচ্ছিলো জীবনের ছন্দ-তাল-লয়। তীর বেঁধা পাখির মতো মেয়েটা ছটফট করতো। কণ্ঠ দিয়ে যদি একটু সুর বের করার সুযোগ পেত তাহলে হয়তো একটু আরাম পেত। কিন্তু কে দেবে তাকে সেই আরাম! বিয়ের পর একবার চেষ্টা করেছিলো সংসারের সং সাজার পাশাপাশি যদি সঙ্গীতের আরাধনা করা যায়। তাই ভর্তি হয়েছিলো প্রতীমা মুখার্জী দিদির কাছে। কিন্তু রায়বাঘিনী ননদীনির চক্রান্তে সেই আরাধনাতেও ছেদ পড়েছিলো।
দুই যুগ কেটে গিয়েছে। এরই মধ্যে ওর সাধের হারমোনিয়ামটা 'হারমোনিয়াম' সিনেমার মতো এর বাড়ি, ওর বাড়ি ঘুরে অবশেষে ভাগ্যক্রমে ওর কাছেই ফিরে এসেছে। বহুবছর পর হারমোনিয়ামটাকে কাছে পেয়ে ওকে আদর করতে করতে অশ্রুধারায় মিশে গিয়েছিলো সেই সুরটা 'মন বলে আমি মনের কথা জানি না'।
সময় বয়ে গিয়েছে নদীর মতো। হারিয়ে গিয়েছে ভাব তরঙ্গের আড়ালে। কিন্তু সুরটা যে মন বাউলার দোতারায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায় হৃদ আঙিনায়। তাই সুরটা হারায়নি। সেই মেয়েটি আজ পঞ্চাশোর্দ্ধ। সে আজ পরিপূর্ণ এক যুবকের মা। পায়ের বেড়িটা আজ আর তার নেই। বছর দুয়েক ধরে সে খুঁজে বেড়াচ্ছে মনের মতো এক সঙ্গীত পাগল। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সেই পাগল কোথায় মিলবে! জীবন খাতার প্রতি পাতায় হিসেব নিকেশটাতো রাখতেই হবে। এই হিসেব নিকেশের খেলায় হারিয়ে যাচ্ছে গুরু-শিষ্যের সুর আদান-প্রদানের আসল খেলা!
জীবনের অপরাহ্নে সে রবি ঠাকুরকেই আঁকড়ে ধরতে চায়। রবি ঠাকুরের গানের প্রতিটা লাইনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিতে চায় জীবনের বাকি সময়টায়। সে আজও আশা করে এখনো সময় আছে, গানে ভুবন ভরিয়ে দেওয়ার। ঐ যে রবি ঠাকুরের গানটা আছে না,
"নিশিদিন ভরসা রাখিস, হবেই হবে
ওরে মন, হবেই হবে।
যদি পন করে থাকিস সে পন তোমার রবেই রবে।" এই ভরসাতেইতো আবার নতুন করে সুর সাধা। সঙ্গীতের আরাধনায় সে কীর্তনের সুরে গেয়ে ওঠে-
" তুমি যত ভার দিয়েছো সে ভার
করিয়া দিয়েছো সোজা।
আমি যত ভার জমিয়ে তুলেছি
সকলই হয়েছে বোঝা
বন্ধু সকলই হয়েছে বোঝা..."
ববিতা সরকার(গুহ রায়)
July, 2026